সুন্দর হাসি ও সুস্বাস্থ্যের জন্য সুস্থ দাঁতের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস এবং অসচেতনতার কারণে দাঁত ও মাড়ির নানা সমস্যা দেখা দেয়। সাধারণত দাঁতের সমস্যাগুলো প্রাথমিক অবস্থায় অবহেলা করার কারণে পরবর্তীতে তা মারাত্মক আকার ধারণ করে।
আজকের এই আর্টিকেলে আমরা দাঁতের সবচাইতে সাধারণ তিনটি সমস্যা; দাঁত ক্ষয়, মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া এবং দাঁতের শিরশিরানি; সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব। এই সমস্যাগুলোর বৈজ্ঞানিক কারণ, লক্ষণ এবং ঘরোয়া ও চিকিৎসীয় সমাধান নিচে তুলে ধরা হলো।
১. দাঁত ক্ষয় বা ডেন্টাল ক্যারিজ (Tooth Decay)
দাঁতের উপরিভাগে ‘এনামেল’ নামক একটি অত্যন্ত শক্ত আবরণ থাকে যা দাঁতকে রক্ষা করে। যখন এই এনামেল স্তরটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখনই দাঁত ক্ষয় শুরু হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে ডেন্টাল ক্যারিজ বলা হয়।
কেন দাঁত ক্ষয় হয়?
দাঁত ক্ষয় হওয়ার পেছনে প্রধান কারণগুলো নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:
- মিষ্টি ও শর্করা জাতীয় খাবার: চিনিযুক্ত খাবার বা কোমল পানীয় খাওয়ার পর মুখে এক ধরনের এসিড তৈরি হয়। এই এসিড দাঁতের এনামেলকে ধীরে ধীরে গলিয়ে ফেলে। দীর্ঘ সময় ধরে এমন চলতে থাকলে দাঁতে গর্তের সৃষ্টি হয়।
- প্লাক ও ব্যাকটেরিয়া: খাবার খাওয়ার পর ঠিকমতো মুখ পরিষ্কার না করলে দাঁতের ফাঁকে খাদ্যকণা জমে ‘প্লাক’ তৈরি করে। এই প্লাকে থাকা ব্যাকটেরিয়া দাঁতের ক্ষয় ত্বরান্বিত করে।
- ভুল পদ্ধতিতে ব্রাশ করা: খুব জোরে ব্রাশ করা বা দীর্ঘ সময় ধরে ব্রাশ না করার ফলে প্লাক জমে ক্ষয় শুরু হতে পারে।
- মুখের লালা কমে যাওয়া: লালা বা স্যালাইভা প্রাকৃতিকভাবে দাঁতকে পরিষ্কার রাখে। কোনো কারণে মুখে লালা নিঃসরণ কমে গেলে (ড্রাই মাউথ) দাঁত ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে।
- বাজে অভ্যাস: ধূমপান, জর্দা বা গুলের ব্যবহার দাঁতের স্বাস্থ্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
লক্ষণসমূহ
- দাঁতের গায়ে কালো বা বাদামি রঙের দাগ দেখা দেওয়া।
- দাঁতে ছোট বা বড় গর্ত সৃষ্টি হওয়া।
- খাবার চিবানোর সময় ব্যথা অনুভব করা বা খাবার গর্তে আটকে যাওয়া।
- মিষ্টি বা ঠান্ডা খাবার খেলে ব্যথা হওয়া।
প্রতিকার ও চিকিৎসা
দাঁত ক্ষয় রোধে এবং প্রতিকারে নিচের পদক্ষেপগুলো জরুরি:
- ফ্লোরাইড টুথপেস্ট: ফ্লোরাইড দাঁতের এনামেলকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। তাই দিনে অন্তত দুবার (সকালে নাস্তার পর ও রাতে ঘুমানোর আগে) ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট দিয়ে ব্রাশ করতে হবে।
- ডেন্টাল ফ্লস: ব্রাশ সব জায়গায় পৌঁছাতে পারে না। তাই দুই দাঁতের মধ্যবর্তী স্থান পরিষ্কার রাখতে রাতে ফ্লস ব্যবহার করা জরুরি।
- খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন: চিনিযুক্ত খাবার, চকোলেট এবং কার্বনেটেড সফট ড্রিংকস এড়িয়ে চলতে হবে। মিষ্টি খাবার খাওয়ার পর অবশ্যই পানি দিয়ে কুলি করতে হবে।
- চিকিৎসা: দাঁতে গর্ত হয়ে গেলে দ্রুত ডেন্টিস্টের পরামর্শে ফিলিং করে নিতে হবে। সংক্রমণ দাঁতের মজ্জা বা পাল্প পর্যন্ত পৌঁছে গেলে রুট ক্যানাল চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
২. দাঁত বা মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া (Bleeding Gums)
দাঁত ব্রাশ করার সময় বা শক্ত কিছু কামড় দিলে মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া একটি সাধারণ কিন্তু সতর্ক হওয়ার মতো লক্ষণ। এটি মূলত মাড়ির প্রদাহ বা জিনজিভাইটিস (Gingivitis)-এর প্রধান লক্ষণ।
রক্ত পড়ার কারণ
- মাড়ির ইনফেকশন: দাঁতের গোড়ায় প্লাক জমে শক্ত হয়ে ‘টারটার’ বা পাথরে পরিণত হয়। এই পাথর মাড়িতে প্রদাহ সৃষ্টি করে, ফলে সামান্য আঘাতেই রক্তপাত হয়।
- ব্রাশ করার ভুল পদ্ধতি: খুব শক্ত ব্রিসলের ব্রাশ ব্যবহার করলে বা জোরে ঘষে ব্রাশ করলে মাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
- ভিটামিনের অভাব: শরীরে ভিটামিন-সি বা ভিটামিন-কে এর ঘাটতি থাকলে মাড়ি থেকে রক্ত পড়তে পারে।
- অন্যান্য রোগ: ডায়াবেটিস বা হরমোনাল পরিবর্তনের কারণেও মাড়ি দুর্বল হয়ে রক্তপাত হতে পারে।
লক্ষণসমূহ
- ব্রাশ বা কুলি করার সময় রক্ত দেখা যাওয়া।
- মাড়ি ফুলে লালচে হয়ে যাওয়া এবং স্পর্শ করলে ব্যথা অনুভব করা।
- মুখে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হওয়া।
- মাড়ি দাঁত থেকে আলগা হয়ে যাওয়া।
সমাধান ও করণীয়
মাড়ি থেকে রক্ত পড়া বন্ধ করতে নিচের নিয়মগুলো মেনে চলুন:
- সঠিক ব্রাশ নির্বাচন: নরম বা মিডিয়াম ব্রিসলের ব্রাশ ব্যবহার করুন। ব্রাশ করার সময় মাড়ির সাথে ৪৫ ডিগ্রি কোণে আলতোভাবে ব্রাশ করতে হবে।
- প্রফেশনাল স্কেলিং: দাঁতে জমে থাকা পাথর বা টারটার ব্রাশ করে দূর করা সম্ভব নয়। এর জন্য ডেন্টিস্টের কাছে গিয়ে স্কেলিং করাতে হবে। বছরে অন্তত একবার স্কেলিং করা জরুরি।
- পুষ্টিকর খাবার: প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ খাবার যেমন—লেবু, আমলকী, পেয়ারা, কমলা ইত্যাদি খেতে হবে।
- লবণ-পানির ব্যবহার: কুসুম গরম পানিতে লবণ মিশিয়ে দিনে কয়েকবার কুলি করলে মাড়ির প্রদাহ কমে এবং রক্তপাত বন্ধ হতে সাহায্য করে।
৩. দাঁতে শিরশির অনুভূতি (Tooth Sensitivity)
ঠান্ডা পানি বা আইসক্রিম খেলে দাঁতে হঠাৎ তীব্র ব্যথা বা শিরশির করে ওঠার সমস্যাকে ডেন্টাল সেনসিটিভিটি বলা হয়। এটি অত্যন্ত অস্বস্তিকর একটি সমস্যা।
কেন শিরশির করে?
আমাদের দাঁতের ভেতরের স্তরের নাম ‘ডেন্টিন’, যা স্নায়ুর সাথে যুক্ত থাকে। সাধারণত এনামেল এবং মাড়ি ডেন্টিনকে ঢেকে রাখে। কিন্তু নিচের কারণগুলোতে ডেন্টিন উন্মুক্ত হয়ে পড়লে শিরশির করে:
- এনামেল ক্ষয় হয়ে যাওয়া।
- মাড়ি নিচে নেমে গিয়ে দাঁতের শিকড় বা রুট বের হয়ে যাওয়া।
- অতিরিক্ত শক্ত ব্রাশ ব্যবহারের ফলে দাঁতের ওপরের স্তর ক্ষয় হওয়া।
- দাঁত ভেঙে যাওয়া বা পুরনো ফিলিং নষ্ট হয়ে যাওয়া।
কখন বেশি হয়?
- অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি বা আইসক্রিম খেলে।
- গরম চা বা কফি পান করলে।
- খুব মিষ্টি বা টক জাতীয় খাবার খেলে।
কার্যকরী সমাধান
- সেনসিটিভ টুথপেস্ট: সাধারণ টুথপেস্টের পরিবর্তে পটাশিয়াম নাইট্রেট সমৃদ্ধ বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডেসেনসিটাইজিং টুথপেস্ট ব্যবহার করতে হবে। এটি দাঁতের স্নায়ুর সংবেদনশীলতা কমায়।
- ব্রাশ করার সতর্কতা: খুব জোরে ব্রাশ করা বন্ধ করতে হবে এবং নরম ব্রাশ ব্যবহার করতে হবে।
- খাবার নিয়ন্ত্রণ: অতিরিক্ত এসিডযুক্ত খাবার (যেমন লেবু বা সোডা) খাওয়ার পরপরই ব্রাশ করা উচিত নয়, কারণ এ সময় এনামেল নরম থাকে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ব্রাশ করতে হবে।
- চিকিৎসা: সমস্যা তীব্র হলে ডেন্টিস্ট ফ্লোরাইড ভার্নিশ বা ডেন্টাল বন্ডিং-এর মাধ্যমে উন্মুক্ত ডেন্টিন ঢেকে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারেন।
পরামর্শ
দাঁতের সমস্যাগুলো প্রাথমিক অবস্থায় প্রতিরোধযোগ্য। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা ব্যথা না হওয়া পর্যন্ত ডেন্টিস্টের কাছে যাই না, যা চিকিৎসার জটিলতা ও খরচ উভয়ই বাড়িয়ে দেয়।
সুস্থ দাঁতের জন্য দৈনন্দিন রুটিন:
- সকালে এবং রাতে ঘুমানোর আগে অবশ্যই দুই মিনিট সময় নিয়ে ব্রাশ করুন।
- নিয়মিত ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার করুন।
- ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য বর্জন করুন।
- প্রতি ৬ মাস অন্তর একজন ডেন্টিস্টের মাধ্যমে দাঁত চেকআপ ও প্রয়োজনে স্কেলিং করান।
মনে রাখবেন, দাঁতের যত্ন কেবল সৌন্দর্যের জন্য নয়, এটি আপনার সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্যও অপরিহার্য। সমস্যা দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।



